যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত

বিশ্বজুড়ে নৌ ও আকাশপথের সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত

বাড়তে পারে ওষুধ ও ইলেকট্রনিকসের দাম

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের বাজার ছাপিয়ে এবার বিশ্বজুড়ে নৌ ও আকাশপথের পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

ভারত থেকে আসা জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, এশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর এবং ইলেকট্রনিকস পণ্য ও ব্যাটারি এবং মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদিত সারসহ প্লাস্টিকের কাঁচামাল সরবরাহ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান এয়ারলাইনসগুলোর কার্গো সেবা স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে পণ্য সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। খবর দ্য হিন্দু।

আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের কারণে নৌপথ অনিরাপদ হয়ে পড়ায় কনটেইনারবাহী জাহাজগুলোকে দীর্ঘ পথ ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছতে হচ্ছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা ব্যবহারে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় কার্গো বিমানের পরিচালন ব্যয় এবং সময় উভয়ই কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ফলে ইলেকট্রনিকস থেকে শুরু করে জরুরি ওষুধ ও তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের জট তৈরি হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা জাগিয়ে তুলছে।

প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর পণ্য, যেমন প্লাস্টিক ও রাবার তৈরির কাঁচামাল (পেট্রোকেমিক্যাল ফিডস্টক) ও নাইট্রোজেন সারেরও অন্যতম প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্য। ভারত থেকে রফতানি হওয়া ওষুধ এবং এশিয়া থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো সেমিকন্ডাক্টর ও ব্যাটারির মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যগুলো এ রুট দিয়েই যাতায়াত করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব পণ্যবাহী জাহাজ দীর্ঘ বিলম্বের মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পশ্চিম এশীয় অঞ্চলের চলমান অস্থিরতায় শুধু নৌপথ নয়, আকাশপথে পণ্য পরিবহন বা এয়ার কার্গো ব্যবস্থাও চরম চাপের মুখে পড়েছে। ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ইরাকের মতো দেশগুলোর আকাশসীমা এবং বিমানবন্দরগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েক হাজার মানুষ ও বিপুল পরিমাণ পণ্য আটকা পড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের তিন প্রধান এয়ারলাইনস এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ এবং ইতিহাদ এয়ারওয়েজের নিজস্ব কার্গো বিমানের বিশাল বহর রয়েছে। এছাড়া এসব এয়ারলাইনস যাত্রীবাহী বিমানের নিচের অংশেও (বেলি কার্গো) নিয়মিত পণ্য পরিবহন করে। বোয়িংয়ের ওয়ার্ল্ড এয়ার কার্গো ফোরকাস্ট অনুযায়ী, ওজনে আকাশপথের পণ্য বৈশ্বিক বাণিজ্যের মাত্র ১ শতাংশ হলেও মূল্যের দিক থেকে এটি প্রায় ৩৫ শতাংশ। কারণ জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, ইলেকট্রনিকস এবং পচনশীল দামি পণ্যগুলো সাধারণত আকাশপথেই পরিবহন করা হয়।

পরিবহন সক্ষমতা হ্রাস, বাড়তি চাহিদার কারণে এয়ার কার্গো বা আকাশপথে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন উপসাগরীয় বিমানবন্দরগুলো যত বেশি সময় বন্ধ থাকবে, বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয়ের ঝুঁকি তত বাড়বে। বিশেষ করে ভারত থেকে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য এ রুটের বিমানবন্দরগুলো প্রধান ‘হাব’ হিসেবে কাজ করে।

অ্যাটমোস্ফিয়ার রিসার্চ গ্রুপের এয়ারলাইনস শিল্প বিশ্লেষক হেনরি হার্টেভেল্ট জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে আকাশপথে যোগাযোগ রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান সংকটে পণ্যবাহী জাহাজগুলো দীর্ঘ বিলম্বের মুখে পড়তে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বিশ্ববাজারে। সময়মতো পণ্য না পৌঁছলে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যাহত হবে, অন্যদিকে ইলেকট্রনিকস ও ওষুধের মতো পণ্যের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।

এদিকে সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা এড়িয়ে চলতে বাধ্য হওয়ায় বিকল্প দীর্ঘ পথ ও জ্বালানি খরচ বাড়ার প্রভাবে উড়োজাহাজের টিকিটের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

তবে সাপ্লাই চেইন বা পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় বিপর্যয় সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট শিল্প খাত এ পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কারু কনটেইনার্সের উত্তর আমেরিকা অঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার মাইকেল গোল্ডম্যান বলেন, ‘‌গত কয়েক বছরে করোনা মহামারীকালীন পণ্য সংকট এবং পশ্চিম এশিয়ায় বারবার তৈরি হওয়া নানা সংঘাত মোকাবেলা করে শিপিং ও লজিস্টিকস শিল্প এখন অনেক বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছে। কয়েক বছর ধরে এ শিল্প মূলত একের পর এক সংকটের মধ্য দিয়েই চলছে।’ তাই এ বিপর্যয় মোটেও নতুন কিছু নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি; বরং এটি আগের সংকটগুলোরই ধারাবাহিকতা মাত্র।

আরও